1. nagorikit@gmail.com : admin :
  2. mdjoy.jnu@gmail.com : admin1 :
আজ- শুক্রবার, ০৭ অক্টোবর ২০২২, ১২:১৮ পূর্বাহ্ন

একটি শহীদ মিনারের জন্য ২৭বছর অপেক্ষা !

  • আপডেট করা হয়েছে বুধবার, ১০ নভেম্বর, ২০২১
  • ২৯২ বার পড়া হয়েছে

মৌমিতা রায় : ‘আমাদের স্কুলে কোন শহীদ মিনার নেই। ২১ শে ফেব্রæয়ারী এলে কোথায় কি ভাবে ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবো এ ব্যাপারে স্যাররাও কিছু বলেন না। প্রতিবছর আমরা ছাত্র-ছাত্রীরা মিলে কলা গাছ দিয়ে বিদ্যালয়ের এক প্রান্তে শহীদ মিনার তৈরী করি, ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করি। তবে এবার আমরা সত্যিকারের শহীদ মিনারেই শ্রদ্ধা জানাবো। এটা আমাদের কাছে খুবই আনন্দের বিষয়।’ কথাগুলো খুলনার তেরখাদা উপজেলার আজগড়া গ্রামের বিআরবি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবম শ্রেনীর ছাত্রী রিম্পা মল্লিকের।

রিম্পার প্রশ্ন অনেক স্কুলেই শহীদ মিনার আছে। তবে কেন তাদের স্কুলে নেই ? স্যারদের কাছে জানতে চাইলে কোন সদুত্তর পাওয়া যায়না। ২১ শে ফেব্রæয়ারির আগে কয়েকদিন বলাবলি করার পর আবার যা তাই। আমাদের চুপ হয়ে যেতে হয়। স্কুলের প্রাক্তন ছাত্রী তমালিকার মতে, শহীদ মিনার নির্মাণের জন্যে অর্থ অবশ্যই একটি বিষয়। তবে তার চেয়ে প্রয়োজন ইতিবাচক মানষিকতা। উদ্যোগ নিলে নিশ্চই সফলতা আসে। শুধুমাত্র রিম্পা বা প্রাক্তন ছাত্রী তমালিকাই নয়, এই আবেগ, এই অনুভুতি, এই প্রশ্ন স্কুলের শিক্ষার্থীসহ এলাকার সর্বস্তরের মানুষের।

জানা গেছে, সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত উত্তর খুলনার তেরখাদা উপজেলার একটি গ্রামের নাম আজগড়া। কৃষি কাজ ও মাছ শিকারই ছিলো গ্রামের মানুষের জীবিকার প্রধান মাধ্যম। খুলনা শহর থেকে খুব বেশি দুরে না হওয়া সত্বেও এই গ্রামে এক সময়ে শিক্ষিত লোকের সংখ্যা ছিলো হাতে গোনা। তাদের অধিকাংশই স্কুলের গন্ডি পার হতে পারেনি। তবে বর্তমানে সেই চিত্রে আমুল পরিবর্তন এসেছে। ১৯৯৪ সালে প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন গ্রামের মানুষ একটি স্কুল করার পরিকল্পনা করেন। তৎকালিন সমাজপতি ও যুবকরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে অর্থ ও বাশের খুটি সংগ্রহ করেন। কয়েকজন দানশীল ব্যক্তি স্কুলের জন্যে জমি দান করেন। স্বেচ্ছা শ্রমের ভিত্তিতে অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে স্বল্প সময়ের মধ্যেই গ্রামবাসি স্কুলটি নির্মাণ করেন। বিনা পয়সায় শিক্ষকতা করতে গ্রামের শিক্ষিত যুবকরা এগিয়ে আসেন। স্কুল প্রতিষ্ঠার এই গোটা প্রক্রিয়ায় যারা অবদান রেখেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন আজগড়া গ্রামের তৎকালিন বাসিন্দা নির্মল কুমার মল্লিক। পরবর্তীতে তৎকালিন সাংসদ প্রয়াত এস এম মোস্তফা রশিদী সুজার সহযোগিতায় বিদ্যালয়ে একটি একতলা ভবন নির্মিত হয়।

আজগড়া গ্রামের বাসিন্দা বিপুল মল্লিক জানান, আগে এই গ্রামের মানুষ তিন কিলোমিটার হেটে রূপসা উপজেলার পালেরহাটে পড়তে যেতেন। এতে বেশ সমস্যাও দেখা দিতে। ইচ্ছে থাকা সত্বেও অনেকের লেখাপড়া করার সামর্থও ছিলো না। তবে গ্রামে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে মানুষ শিক্ষার আলো দেখতে শুরু করেছে। বিশেষ করে নারী শিক্ষায় ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। আগে যেখানে ছেলেদের মধ্যে এস এস সি পাশ খুজে পাওয়া যেতো না এখন সেই গ্রামে বিচারক, সরকারি বড় কর্মকর্তাও রয়েছে। ঘরে ঘরে এখন শিক্ষিত মানুষ। তবে এখনও এলাকার মানুষ গরীব তাই স্কুলের উন্নয়নের জন্য তারা তেমন একটা ভুমিকা রাখতে পারেনা।

স্কুলের প্রাক্তন ছাত্রী সাথী জানান, আমাদের স্কুলে একটি শহীদ মিনার নির্মাণের দাবি ছিলো দীর্ঘ দিনের। বর্তমান সভাপতি সাংবাদিক মল্লিক সুধাংশুর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় দীর্ঘ দিনের সেই দাবি পুরণ হতে চলেছে। শুধু তাই নয়, সভাপতির প্রচেষ্টায় এর আগে বিদ্যালয় চত্বরে গণহত্যার স্মৃতি ফলক নির্মিত হয়েছে। মুজিববর্ষ উপলক্ষে বিদ্যালয় চত্বরে তিনি নিজ অর্থায়নে জাতির পিতার দৃষ্টিনন্দন ম্যুরাল নির্মাণের কাজও শুরু করেছেন। বিদ্যালয়টি আর যা হোক মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভিত্তিক একটি বিদ্যালয় হিসেবে মাথা উচু করে দাড়াবে বলে আমার বিশ্বাস।

বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক উৎপল গাইন জানান, আমাদের শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় চারশত। একটি মাত্র বিদ্যালয় ভবন। ক্লাস সংকটে চরম সমস্যায় পড়তে হয়। এছাড়া ছাত্র-ছাত্রীদের কোন কমন রুম নেই। স্কুলে টিফিনের সময় তাদের বাইরে বাইরেই থাকতে হয়। তার মতে, একটি ভবন নির্মাণ করা খুবই জরুরী হয়ে দাড়িয়েছে।

বিদ্যালয়ের সভাপতি মল্লিক সুধাংশু জানান, আমরা অন্ধকারে আলো বিলাতে চাই। যে গ্রামে এক সময় শিক্ষিত মানুষ ছিলো না এখন সেই গ্রামে ঘরে ঘরে শিক্ষিত মেয়েরা রয়েছে। একটি স্কুল প্রতিষ্ঠার পর থেকে পাল্টে গেছে গোটা এলাকার মানুষের শিক্ষার চিত্র। শেখ হাসিনা সরকারের সার্বিক সুযোগকে আমরা কাজে লাগাতে চাই আমরা। তবে এর জন্য দরকার উদ্যোগ গ্রহণ। আমি গুরুত্ব দিয়েছি বিদ্যালয়টিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভিত্তিক একটি বিদ্যাপিঠ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছি। তারই অংশ হিসেবে গণহত্যার স্মৃতিফলক নির্মিত হয়েছে। জাতির পিতার ম্যুরাল নির্মাণ কাজ চলছে। আশা করি অবকাঠামোগত অন্যান্য সুযোগও পর্যায়ক্রমে তৈরি হবে।

এদিকে জেলা প্রশাসনের আর্থিক সহযোগিতায় মঙ্গলবার বিদ্যালয় চত্বরে একটি শহীদ মিনার নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করা হয়। খুলনার জেলা প্রশাসক মোঃ মনিরুজ্জামান তালুকদার প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে শহীদ মিনার নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করবেন। বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সভাপতি মল্লিক সুধাংশুর সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে খুলনা জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আছাদুজ্জামান, তেরখাদা উপজেলার চেয়ারম্যান শেখ শহীদুল ইসলাম, উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবিদা সুলতানা, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম, দৈনিক পুর্বাঞ্চলের নির্বাহী সম্পাদক আহমদ আলী খান বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন। স্বাগত বক্তৃতা করেন প্রধান শিক্ষক রমেন্দ্র নাথ মল্লিক। স্বাস্থ্যবিধি মেনে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন জেলা-উপজেলার পদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ, বিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং এলাকার বিশিষ্টজনেরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন
ডিজাইনঃ নাগরিক আইটি (Nagorikit.com)