1. nagorikit@gmail.com : admin :
  2. mdjoy.jnu@gmail.com : admin1 :
আজ- বৃহস্পতিবার, ০৬ অক্টোবর ২০২২, ১১:৪৯ অপরাহ্ন

১৭ডিসেম্বর খুলনা মুক্ত দিবস : ৪৯বছরেও মুক্তিযুদ্ধের অধিকাংশ স্মৃতিবিজড়িত স্থান সংরক্ষিত হয়নি !

  • আপডেট করা হয়েছে বুধবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০২০
  • ৩৪৪ বার পড়া হয়েছে

মল্লিক সুধাংশু : ১৬ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস। বাংলাদেশের স্থপতি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে মুক্তিকামী বাঙালী দীর্ঘ ৯মাস রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর এদিন পাকিস্থানী বাহিনীকে পরাজিত করে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। তবে বিজয়ের এই স্বাদ পেতে খুলনাবাসীকে অপেক্ষা করতে হয় আরো একটি দিন। ১৯৭১সালের ১৭ডিসেম্বর খুলনা সার্কিট হাউজ ময়দানে মিত্রবাহিনীর মেজর দলবীর সিং এর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্থানী বাহিনীর আত্মসর্ম্পনের মধ্য দিয়ে মুক্ত হয় খুলনা। এর আগে এদিন সকালেই শহীদ হাদিস পার্কে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। চূড়ান্ত বিজয়ের আনন্দে ফেঁটে পড়েন খুলনাবাসী।

এই বিজয় অর্জন করতে দীর্ঘ সময় ধরে খুলনার বিভিন্ন অঞ্চলে মিত্র ও মুক্তি বাহিনীর সাথে পাকিস্থানী বাহিনী ও তাদের এ দেশিয় দোষর রাজাকার আলবদর বাহিনীর বেশ কয়েকটি যুদ্ধ হয়। অনেক এলাকায় গণহত্যার ঘটনা ঘটে। বধ্যভুমিতে পরিণত হয় অনেক স্থান। ইতমধ্যে কিছু কিছু যুদ্ধ ক্ষেত্র, গণহত্যা ও বধ্যভুমির সংরক্ষণ করা হয়েছে। নির্মাণ করা হয়েছে স্মৃতিসৌধও। তবে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত অধিকাংশ স্থান এখনও অবহেলিত, অরক্ষিত। খুলনাঞ্চলেনের মুক্তিযোদ্ধা, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, পেশাজীবী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ সর্বস্তরের মানুষের দাবি মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ধরে রাখতে সংরক্ষণ করা হোক মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থান সমুহ। নির্মাণ করা হোক মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক স্মৃতিসৌধ।

মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের প্রাক্কালে খুলনার শিরোমনি এলাকায় মিত্রবাহিনীর সাথে খানসেনা এবং কপিলমুনিতে মুক্তিবাহিনীর সাথে রাজাকারদের তুমুল যুদ্ধ হয়। এছাড়াও গল্লামারী তকালিন রেডিও স্টেশন, পাইকগাছার বাড়োআড়িয়া, ফুলতলা বাজার, তেরখাদার ইখড়ি-কাটেঙ্গাসহ বেশ কয়েকটি স্থানে খান সেনাদের সাথে মিত্র ও মুক্তিবাহিনীর সাথে যুদ্ধ হয়। এর মধ্যে শিরমনির ট্যাঙ্ক যুদ্ধের ঘটনা বাংলাদেশসহ বিশ্বের কয়েকটি দেশের সামরিক প্রশিক্ষণের অন্তর্ভুক্ত। সম্মুখ সমর ছাড়াও খুলনার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৯০টির মতো গণহত্যার ঘটনা ঘটে। এসব গণহত্যার মধ্যে সবচেয়ে বড় গণহত্যার ঘটনা ঘটে ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগরে। ১৯৭১ সালের ২০ মে ভারতে যাওয়ার পথে অপেক্ষমান ১০ হাজারের অধিক মানুষকে গুলি করে হত্যা করা হয়। খুলনার বটিয়াঘাটা, বাজুয়া, দাকোপ, বাগেরহাটের রামপাল, মোংলা, মোল্লার হাট, বরিশালের পিরোজপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রাণের ভয়ে ভারতে যাওয়ার পথে এখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পৃথিবীর ইতিহাসে এটি বৃহত্তম গণহত্যা বলে মনে করেন গবেষকরা। বর্তমানে চুকনগরে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়েছে। তবে চুকনগরের গণহত্যার স্থানে কমপ্লেক্স নির্মাণের দাবি এখনও পুরণ হয়নি। এছাড়া চলতি মাসেই কপিলমুনির যুদ্ধ ক্ষেত্র সংরক্ষণের জন্যে সরকারের পক্ষ থেকে প্রাথমিক ভাবে দুই কোটি টাকা বরাদ্দের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করা হয়েছে। তবে এখনও পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য গণহত্যার মধ্যে শলুয়া গণহ্যা, রংপুর গণহত্যা, শোলগাতি গণহত্যা, থুকড়া গণহত্যা, খর্নিয়া, বারাকপুর, দেয়াড়া, বাজুয়া, চালনা, সাহেবারাব, হড্ডা, বাড়োআরিয়াসহ অনেক স্থানে কোন স্মৃতি সৌধ নেই। সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এসব স্থান সমুহ।

এ ব্যাপারে ‘গণহত্যা বধ্যভুমি ও গণকবর জরিপ খুলনা জেলা’ বই’র লেখক বিএল কলেজের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক অমল কুমার গাইন জানান, ৯০টির মতো গণহত্যার ঘটনা ঘটে। ১৮টি স্থানে স্মৃতিসৌধ নির্মিত হলেও অধিকাংশ গণহত্যার স্থানগুলো রয়েছে অরক্ষিতি। এগুলো বিস্মৃত হচ্ছে মানুষের স্মৃতি থেকে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত এসব স্থানগুলো সংরক্ষণের মাধ্যমে, স্মৃতিসৌধ নির্মাণের মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার স্মৃতি ধরে রাখা উচিত বলে মনে করেন এই ইতিহাসবিদ।

সম্মুখয্দ্ধু ও গণহত্যা ছাড়াও খুলনার গল্লামারি, ফরেস্ট ঘাট, ক্রিসেন্ট জুট মিল, রেলওয়ে কলোনী, ফেরিঘাট, রেলওয়ে স্টেশন, মওলানা ভাসানী বিদ্যাপিঠ, প্লাটিনাম জুট মিল, মতিউল্লাহর বাড়ি, গোয়াল পাড়া, পিপলস জুট মিল, দৌলতপুর বাজার ঘটা, সেনের বাজার, থুকড়া, চেচুড়ি ঘাট খর্নিয়া খেয়া ঘাট, শলুয়া, পিপরাইল চারাবাটি ঘাটসহ অন্তত ২৭টি স্থান বদ্ধভুমি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তবে এর মধ্যে এ পর্যন্ত ৪/৫টি স্থানে স্মৃতি ফলক নির্মিহ হলেও অধিকাংশ বদ্ধভুমি রয়েছে অবহেলিত।

জানা যায়, ১৯৭১: গণহত্যা নির্যাতণ আর্কাইভ ও জাদুঘর-এর তত্ববধানে সরকারের একটি প্রকল্পের মাধ্যমে ২০১৪ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত খুলনার মোট ১৮টি গণহত্যার স্থানে স্মৃতিফলক নির্মিত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখ যোগ্য স্থানগুলো খুলনা সার্কিট হাউস, ভুতের বাড়ি আনসার ক্যাম্প, আজগড়া বিআরবি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, চরের হাট, প্লাটিনাম জুট মিল, নিউজ প্রিন্ট মিল, খালিশপুর মুন্সিবাড়ি, পাইওনিয়ার কলেজ, আরআরএফ, বটিয়াঘাটার বাদামতলা, গজালিয়া গল্লামারিসহ কয়েকটি গণহত্যার স্থান রয়েছে।

বীর মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক মকবুল হোসেন মিন্টু মনে করেন, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত সকল স্থানেই স্মৃতি সৌধ নির্মাণ করা  উচিত। গল্লমারি, চুকনগর, শিরোমনিসহ কয়েকটি স্থানে স্মৃতি সৌধ নির্মিত হয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত সকল স্থানেই সরকার স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করবে।

বীর মুক্তিযোদ্ধা স.ম.বাবর আলী মনে করেন, ‘স্বাধীনতার ৪৯ বছরেও খুলনা অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ধরে রাখতে তেমন কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। সংরক্ষণ করা হয়নি যুদ্ধক্ষেত্র, গণহত্যার স্থান বা বদ্ধভূমিগুলো। দুই একটি স্থান ছাড়া অধিকাংশস্থানে নির্মিত হয়নি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সৌধ। তিনি মনে করেন, সরকার এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।’

এব্যাপারে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক প্রফেসর ডক্টর ফায়েক উজ্জামান মনে করেন, একটা জাতির ইতিহাসকে সংরক্ষণের জন্য মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থান সমুহে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা গুরুত্বপুর্ণ। আমরা বিজয়ী জাতি। বিজয়ের স্মারক হিসেবে এগুলো সংরক্ষণ করা উচিত। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী দীর্ঘদিন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকার কারণে এসব স্থান সমুহ অবহেলিত ছিলো। তবে বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ক্ষমতায় থাকায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। সরকারের ধারা বাহিকতা বজায় থাকলে আগামীতে কয়েক বছরে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থান সমুহে বিজয়ের স্মারক করা হবে।

 

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন
ডিজাইনঃ নাগরিক আইটি (Nagorikit.com)